ভালোবাসা তারপর
Personal Life

ভালোবাসা তারপর

May 10, 2019   |    5265


স্কুলে পড়ার সময় থেকে একটা মেয়ের সাথে ভালো পরিচয় ছিলো। ঢাকা বিশ্ববিদ‍্যালয়ে ভর্তি হবার পর দেখলাম, মেয়েটাও আমার বিল্ডিং-এ ক্লাস করে। প্রতিদিন ক্লাস শেষ হবার পর নিচে নামলেই তার সাথে দেখা। দুইজনই মোকাররম ভবনের সামনে দাড়িঁয়ে একই জায়গার উদ্দেশ‍্যে রিকশা ঠিক করি। একদিন হঠাৎ বলেই ফেললাম, “চলো একসাথে যাই।” মেয়েটাও রাজি হলো।


সেই থেকে শুরু। প্রতিদিন ক্লাস শেষে নিচে এসে দাড়িঁয়ে থাকতাম। মেয়েটা আসলে তারপর রিকশা ঠিক করতাম। যাতে দুইজনে একসাথে বাসায় যাওয়া যায়। জানুয়ারির শেষের দিকে মেয়েটার জন্মদিন। আমি তাকে উইশ করতে ভুলে গেলাম। কারণ, জীবনের সব গুরুত্বপূর্ণ মুহুর্তে আমি ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুমালে আমার কোন হদিস পাওয়া যায় না। যথারীতি শুরু হলো ঝগড়া।


ঝগড়া থেকে কথা বলা বন্ধ। কেউ কারো ফোন ধরে না। একদিন ক্লাস শেষে নিচে নেমে দেখি, মেয়েটা দাড়িঁয়ে আছে। আমি রিকশা ডেকে উঠে বসলাম। রিকশাওয়ালা মামা ঘটনার মাহাত্ম‍্য উপলব্ধি করতে পেরে কিছুক্ষণ ঠায় দাড়িঁয়ে রইলো। আমি কিছু বললাম না। মেয়েটা এমনিতেই রিকশায় উঠে বসলো। 


রিকশায় কেউ কারো সাথে কথা বলে না। রিকশা থামলো। একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকলাম। খাবার অর্ডার করা হলো। এখনো কথা নেই। হঠাৎ শুরু হলো তুমুল ঝগড়া। এই কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে মেয়েটা বলে ফেললো,


“ভালোবাসি তোমায়।”


আমি অনেকক্ষণ ধরে ব‍্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করলাম। 


প্রথম প্রেমের সেই তো শুরু। প্রথম প্রেমটা সবচেয়ে মজার। কারণ, দুজনের কেউই বোঝে না কি করতে হবে। আগের দিনের বন্ধু এখন প্রেমিকা। আগে রিকশায় উঠলে হাত ধরে বসতে হতো না। এখন হয়। জীবনের কি একটা পরিবর্তন! প্রথম প্রেমটা বর্ষার প্রথম বৃষ্টির মতো। পলক না পড়তেই আপনি এক্কেবারে ভিজে যাবেন।


ভালোবাসা শুরুর মাত্র ৯ দিনের মাথায় ভ‍্যালেন্টাইন্স ডে। দুজনেই ঠিক করলাম, আমরা অনেক কুল। এই জাতীয় জিনিসপত্র আমরা কেয়ার করি না। ১৪ ফেব্রুয়ারি ঠিকই দুজনে সারপ্রাইজ গিফট নিয়ে হাজির। ভাগ‍্যিস ১৩ তারিখ টিউশনির টাকা পেয়েছিলাম!


প্রথম প্রেমের একটা বড় ট্রেইনিং হলো মিথ‍্যা কথা বলতে শিখা। বাসায় বাবা-মাকে নানা অজুহাতে বানিয়ে মিথ‍্যে বলে ডেটে যেতে হয়। আজকে স্টুডেন্টের ফাইনাল পরীক্ষা, কালকে বন্ধুর জন্মদিন, পরশু গ্রুপ স্টাডি। অজুহাত একশো’টা; উদ্দেশ‍্য একটাই।


আমি কি করিলে বলো পাইবো তোমারে, রাখিবো আঁখিতে আঁখিতে…


প্রথম প্রথম কেউই ডেটিং এটিকেটের সাথে অভ‍্যস্ত না। টেবিলের উল্টো পাশে মুখোমুখি বসতে হবে নাকি পাশাপাশি কাধঁ লাগিয়ে বসতে হবে সেটা বুঝতেই গায়ের ঘাম ছুটলো। ক্লাস শেষে মেয়েটা ডেটে এসে চুপ করে বসে আছে। আমি জিজ্ঞাস করলাম, “তোমার কি মন খারাপ? কিছু হয়েছে?” সে বললো, “কিছু হয় নাই।”


এই “কিছু হয় নাই” জগতের সবচেয়ে বড় কোড। এটা এনিগমা ব্রেক করার থেকেও কঠিন। অ‍্যালান টিউরিং স্বয়ং এর মর্ম উদ্ধার করতে পারবেন না। “কিছু হয় নাই” মানে “অনেক কিছু হয়েছে যার জন‍্য সব দোষ আমার।”


কিন্তু, আমার গুরু অপরাধটা কি? 


খুব সাধারণ একটা অপরাধ। গতরাতে ফোনে কথা বলার সময় আসলে রফিক স‍্যারের অর্গানিক কেমিস্ট্রি হোমওয়ার্ক করছিলাম। ও কি একটা জিজ্ঞাসা করতেই উত্তরে বলে ফেললাম “নিউক্লিওফিলিক অ‍্যাটাক”। ব‍্যস! অ‍্যাটাক আর ঠেকায় কে! সেই অ‍্যাটাক চললো এক সপ্তাহ। আমিও কিন্তু দুধে ধোয়া তুলসী পাতা ছিলাম না। ক্লাস শেষে চারটা টিউশনি করে বাসায় গিয়েই ঘুম। গুড নাইট, গুড মর্নিং এর কোন রেওয়াজ করতাম না। করবো কীভাবে? এগুলো যে করতে হয় সেটাই তো জানতাম না।


যথারীতি সদ‍্য বিশ্ববিদ‍্যালয় উঠা ভালো মেয়েটাও টিপিকাল ছেলেদের কমন ব‍্যাপারগুলো জানতো না। যখন প্রথম এইগুলো বুঝতে পারলো তখন যথারীতি বলে উঠলো, “তোমরা ছেলেরা এতো বিরক্তিকর কেন?” কথাটা কিয়দাংশ সত‍্যও বটে। প্রথম তিনমাস দুজনে রাত জেগে এয়ারটেলের ৩৩ পয়সা প্রতি মিনিটে ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলতাম। সকাল আট-টায় যথারীতি ক্লাস ঢুকতে পারতাম না। কিন্তু, ক্লাসের কে তোয়াক্কা করে? অপেক্ষা তো দুপুর বেলার।


দুপুরে দুজনে খেতে টিএসসিতে যেতাম। যথারীতি খাবারটা জঘন‍্য; গরমটা প্রচন্ড। তারপরও কেন টিএসটি যেতাম? কারণ একটাই, একটু বেশী সময় মেয়েটার কাছে থাকা যাবে। কোন কোন দিন দুপুরে হিউম‍্যান ফিজিওলজি ক্লাস থাকতো। সেই ক্লাসটায় আমার অসম্ভব ঘুম পেতো। কোনদিনই ক্লাসটা করতে চাইতাম না। তাই, সোম আর বুধবার দুপুরের খাবারের সময় নানা ফন্দি ফিরিক্কি করে মেয়েটাকে ক্লাস বাঙ্ক দেওয়াতাম। নিজেও দিতাম। সেই কোর্সেই অ‍্যাটেনডেন্সের নাম্বার না পাওয়ায় আমার সিজিপিএ-৪.০০ মিস হয়! ব‍্যাপারটায় আমার একটা ফোঁটাও আক্ষেপ কাজ করে না। চৈত্রের সেই ভর দুপুরে মেয়েটার সাথে ডাকসুর লাচ্ছি খেতে খেতে কলাভবনে হেঁটে গিয়ে আড্ডা মারাটা কোর্সে এ+ পাওয়ার থেকে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ মনে হতো।


এভাবেই দিন চলতো আমাদের। আজকে বেইলী রোড, কালকে রাইফেলস, পরশু ধানমন্ডি, তরশু মোহাম্মদপুর। প্রেম কেজি দরে মেপে কুলানো যাচ্ছে না; মেট্রিক টনে মাপতে হচ্ছে। ইতোমধ‍্যে বন্ধু মহলেও ব‍্যাপারটা জানাজানি। সামাজিক স্বীকৃতি ভালোবাসার একটা বড় অংশ। আমি তাকে আমার বন্ধুদের সাথে দেখা করলাম। সেও তার বন্ধুদের সাথে একে একে দেখা করালো। ভালোবাসার প্রথম ছয়টা মাস আপনার এই করতে করতেই চলে যাবে।


একসময় শেষ হলো হানিমুন পিরিয়ড। এবার শুরু ম‍্যারাথন গেইমের। এখন তো আর প্রতিদিন দেখা করতে ইচ্ছা করে না! কেন? কি হয়েছে? সে কি পুরানো হয়ে গেছে? নাকি আমিই পরিবর্তিত? দোষটা কার?


দোষটা কারোরই নয়। দোষটা সময়ের। সময় ব‍্যাটা বসে থাকতে পারে না। সব সময় ছুটতেই থাকে। আস্তে আস্তে আমাদের ইমোশনগুলোও পরিণত হতে শুরু করলো। এখন আর প্রতিরাতে ফোন না দিলেও চলে। প্রতি সপ্তাহে দেখা না হলেও পোষায়। মাঝে মাঝে ক্লাসের ফাঁকে বারান্দা থেকে নিচে তাকালেই দেখতাম মেয়েটা হেঁটে যাচ্ছে। মুঠোফোনের ক্ষুদেবার্তায় লিখতাম “তোমার চুলগুলো অনেক সুন্দর। একটু উপরে তাকাও।” কান পর্যন্ত বিস্তৃর্ত একটা হাসি নিয়ে মেয়েটা উপরে তাকাতো। ব‍্যাস! এভাবেই চলতে থাকে জীবন।


প্রথম প্রেমের প্রথম বর্ষপূর্তি একটা বড় মাইলস্টোন। শুধু গিফট দিলেই হবে না, সেটা ক্রিয়েটিভও হতে হবে। আমি নিলক্ষেত-নিউ মার্কেট-গাউছিয়া ঘেঁটেও ভালো কিছু কিনতে পারলাম না। মেয়েটা বাসায় বসে কয়েকটা রং পেন্সিলের আচঁড়ে আমাদের ভালোবাসার গল্পটাকে কার্টুন দিয়ে একে ফেললো। তার সেই ৪ বাই ৪ ইঞ্চি কার্টুনের বইটার সামনে আমার গিফট বাক্সটাকে বেশ ক্ষুদ্র দেখাচ্ছিলো। আবেগ বড় কঠিন ব‍্যাপার!


এক বর্ষপূর্তির পর মেয়েটা বুঝতে পারে এই রিলেশন হয়তো টিকবে। তাই পারিবারিক মুলাকাত পর্ব সারতে হবে। যথারীতি মেয়েদের এই ক্ষেত্রে বড় ভরসা হলো “বড় বোন”। কোন এক সন্ধ‍্যায় হাতিরপুলের শর্মা হাউসে বড় বোন আমাদের ট্রীট দিলেন। সেখানে বেশ অভিভাবকসুলভ আচরণ করলেন। এই বড় বোনই যখন তার বয়ফ্রেন্ড নিয়ে ডেটে যান তখন কি করেন সেটা চিন্তা করে বেশ মজা পাচ্ছিলাম।


প্রথম রিকশা ভ্রমণ, প্রথম ভালোবাসা নিবেদন, প্রথম চুম্বন, প্রথম ফাল্গুন, প্রথম বৈশাখ, প্রথম বৃষ্টিতে ভেজা, প্রথম ঈদ, প্রথম ঝগড়া, প্রথম মিটমাট। এভাবে একসময় প্রথমের পাল্টাটা ফুরিয়ে যায়। এরপর শুরু হয় সব দ্বিতীয়, সব তৃতীয়… 


এরপর কোন একদিন ভয়ানক কিছু একটা খারাপ কাজ করলাম। মেয়েটা ভীষণ রাগ। ফোন উনি ধরবেন না। কি আর করার। তার বাসার নিচে গিয়ে দাড়িঁয়ে আছি। সে জানালা খুলে তাকালো। অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলো। তারপর মুঠোফোনটায় বার্তা আসলো, “নাহ! এই যাত্রায় উতরানো যাবে না।” 


“মৃত মানুষের শোক ভোলা যায় না বলে একটা ভুল কথা প্রচলিত আছে। মৃত মানুষের শোক সবচেয়ে সহজে ভোলা যায়। যে শোক সহজে ভোলা যায় না তা হলো জীবিত মানুষ হারিয়ে যাওয়ার শোক।” (হুমায়ূন আহমেদ)


বাসায় ফেরত আসলাম। প্রথম প্রেমের উত্তেজনা যেমন অনেক প্রবল, সেই প্রেম ভঙ্গের ধাক্কাটাও তেমনই প্রচন্ড। আপনি কিছুদিন কাদঁবেন, কিছুদিন বন্ধুদের বোঝাবেন সব ঠিক হয়ে গেছে। কোন এক রাতে তাকে ফোন দিয়ে বললেন, “খুব মিস করি তোমায়।” মেয়েটা উত্তরে শুধুই চোখের পানি ফেলবে।


কষ্ট গুলো, শিকড় ছড়িয়ে…
সেই ভয়ানক একা চাদঁটার সাথে…
স্বপ্নের আলোতে, যাবো বলে…
যখন চোখ ভিজে যায় রাতে…


একটা ভালো খবর হলো, সময় ব‍্যাটা বসে থাকে না। সময় দৌড়াবে। সেই দৌড়ে চোখের পানি, আবেগের সাগর শুকিয়ে যাবে। জীবনের প্রথম প্রেমের পর দ্বিতীয় প্রেম আসলো। এবার জানি কি কি ভুল করা যাবে না। কখন মেসেজ পাঠাতে হবে। কখন “আমি ঠিক আছি” মানে “আমি ঠিক নেই, তুমি আমার কষ্টের কারণ” বলে ডিকোড করতে হবে। আস্তে আস্তে মানুষ ভুল কম করে। একই সাথে আবেগের পরিমাণটাও কমিয়ে দেয়। কারণ, ভালোবাসতে সাহস লাগে। আবেগের বিনিয়োগ যতটা বেশী, সেই প্রেমের ব‍্যর্থতার গ্লানিটাও ততটাই প্রখর। 


প্রথম ভালোবাসায় মানুষ দুজনে মিলে নিজেকে অন‍্যের জন‍্য বদলাতে শিখে। দ্বিতীয় প্রেমে মানুষ নিজের সাথে মনের মিল এমন কাউকে খুজেঁ বের করে। তৃতীয়টাতে সে আরেকটু বেশী মিল-অমিলের কথা চিন্তা করে। এক সময় এমন একটা পর্যায়ে সে পৌছায় যে, এই ব‍্যাপারগুলো একটা রুটিনের মতো মনে হয়। 


কাউকে ভালো লাগবে। তার সাথে ডেটে যাবেন। প্রেম হবে। ব্রেক আপ হবে। নতুন প্রেম হবে। 


একসময় আবেগ ব‍্যাটা পালিয়ে যায়। তখন সবাই প্রেমের জায়গায় ক‍্যারিয়ার বেছে নেয়। নিজের সব ইমোশোন ঢালে কাজে। রাত ১২ টায় অফিসে বসে ইন্সটাগ্রামে স্টোরি দিয়ে দুনিয়াকে দেখায় সে অনেক কাজ করছে। তার আর অন‍্য কারোর দরকার নেই।


গত শনিবার অক্সফোর্ডে আমার কলেজের বড় একটা ডিনার ছিলো। ডিনার শেষে কলেজের বাগানে বসে আছি। হঠাৎ এক সুন্দরী কানাডিয়ান বান্ধবী আমার পাশে এসে বসলো। হাল্কা কথা-বার্তার এক পর্যায়ে গলার বো-টাইটা খুলে বললো, “এইভাবে বেশী ম‍্যানলি লাগে।” আমি অনেকক্ষণ তার কথা শুনে বললাম, “সপ্তাহে দিনের আলো দেখার সময় হয় না আমার। তোমাকে বো-টাই খুলতে দেয়ার মতো সময় নেই বললেই চলে। ভালো থাকো। আবার দেখা হবে।”


বাসায় এসে ঘুমিয়ে পড়লাম। মাত্র ৬-৭ বছরের মাথায় আমরা কত বদলে যাই! যেই ছেলেটা আগে বান্ধবীর সাথে রিকশায় বাসায় যাওয়ার জন‍্য গরমে দাড়িঁয়ে থাকতো সেই এখন ল‍্যাবের এক্সপেরিমেন্টের কথা বেশী চিন্তা করে। মাঝে মাঝে ল‍্যাবের ফাঁকে কফি ব্রেকে চিন্তা করি, সেই মেয়েটা এখনো কি রং পেন্সিল নিয়ে আকঁতে বসে?


মেঘের দেশে এখনো কি তুমি, হারাও আনমনে?
কবিতা কি লেখো এখনো আমায় ঘিরে? 
বৃষ্টি নামে যখন তোমার ওই শরীরে…
আমার ছোঁয়া কি পাও বৃষ্টির মাঝে?


বি.দ্র. এই গল্পের ৯৩% ঘটনা বানোয়াট এবং নেহায়েত মিথ‍্যাকথা।



Contact

Hi there! Please leave a message and I will reply for sure. You can also set an appointment with me for the purpose of Motivation, Counselling, Educational Advising and Public Speaking Events by filling this form up with your contact info.

© 2019 Shamir Montazid. All rights reserved.
Made with love Battery Low Interactive.